মেনু নির্বাচন করুন
Text size A A A
Color C C C C
পাতা

ভাষা ও সংষ্কৃতি

মানুষের সমাজবদ্ধতার সাথে ভাষার উদ্ভব জড়িত, কারণ পরস্পরের কাছে মনের ভাব ব্যক্ত করার জন্যই ভাষার আবশ্যিকতা। সংস্কৃতির সাথে রয়েছে ভাষার ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ। আঞ্চলিক ভাষা বিকশিত হয় কোন নির্দিষ্ট সাংস্কৃতিক অঞ্চলকে কেন্দ্র করে। মোংলা সাংস্কৃতিক অঞ্চল স্বতন্ত্র হয়েছে একদিকে পশুর নদী অন্যদিকে সুন্দরবন এলাকার মানুষের সুন্দরনকে ঘিরে জীব বৈচিত্রের সম্পর্ক এছাড়া মোংলা বন্দরে কাজের থোজে আশা দেশের বিভিন্ন জেলা খেকে আগত মানুষের মিলিত ভাষা ও সংস্কৃতি মিলিত হয়ে একটি
জেলার আঞ্চলিক/স্থানীয় ভাষা: অমনি বাঘা বাগদি আইশে কল “ফটিকদা, মা ডাকতিছে”। ফটিক কল “যাব না”। বাঘা তারে জোর কইরে কোলে তুইলে নয়ে গেল, ফটিক কিছু না পাইরে রাগের চোটে আত-পাও নাড়াতিলো। ফটিকরে দেইহে তার মা আগুনির মূর্তির মতন অইয়ে গেল, কল “ফিরে তুই মাখনরে মারিছিত” ফটিক কল “না মারি নেই”। “ফিরে আবার মিত্য কতা কইস”। “কনো সুময় মারি নেই। মাখনের ধরে বাত্বা নও”।
প্রচলিত বুলি, বচন, কৌতুক, জোকস, প্রবাদবাক্য

লোক সংস্কৃতি, লোক উৎসব, লোকসংগীত, লোকগাঁথা


নববর্ষ ও মেলা:
মোংলা উপজেলায় বর্ষবরণের প্রচলন শুরু  হয় হিন্দু রীতি অনুযায়ী। ১লা বৈশাখে মেলা উপলক্ষে মহিলারা বাপের বাড়ীতে নাইয়র আসত এবং মেলায় এসে ছোট বাচ্চারা খেলনা, বাঁশি, কিনতো। মেলায় বিভিন্ন রকম সার্কাস, দোলনা খেলা চলতো।
যাত্রা গান:
সাধারনত শীতকালে প্রাচীন লোককাহিনীর উপর ভিত্তি করে যাত্রার আয়োজন করা হয়। এই সব যাত্রা এবং যাত্রাগান কখনো কখনো রাতব্যাপী হয়ে থাকে। যেসব কাহিনী/বিষয়ের উপর ভিত্তি করে যাত্রা হয় তমধ্যে মহুয়া, নবাব সিরাজ-উদ-দৌলা এবং স্থানীয় ভাবে রচিত বিভিন্ন কাহিনী/উপাখ্যান অন্যতম।
পালা গান:বর্তমানে পালাগানের আয়োজন হয় না বললেই চলে। তবে পূর্বে বিভিন্ন স্থানে পালাগানের আয়োজন করা হতো।
নৌকা বাইচ:
বর্ষাকালে নদী বা বড় বড় খালগুলি যখন পানিতে পরিপূর্ণ থাকে তখন বিভিন্ন স্থানে নৌকাবাইচের আয়োজন করা হয়ে থাকে। প্রতিযোগিতার আকারে আয়োজিত এসব নৌকা বাইচ অনুষ্ঠান স্থানীয় প্রশাসন এর সহযোগিতায় আয়োজন করা হয়।
বিয়ে/জম্মদিন/বিবাহ বার্ষিকীর আনুষ্ঠানিকতা সংক্রান্ত
বাংলাদেশের অন্যান্য জেলার মতোই সামাজিক আচার অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়েই ময়মনসিংহ জেলায় বিয়ে অনুষ্ঠিত হয়ে থাকে। তবে জম্মদিন, বিবাহ বার্ষিকী পালনের প্রচলন আগে তেমন না থাকলেও ইদানিং মধ্যবিত্ত ও উচ্চবিত্তদের মাঝে তা ব্যাপকভাবে দেখা যাচ্ছে। বিয়েতে বরের পক্ষ থেকে বরযাত্রী যায় কনের বাড়ীতে। কনের বাড়ীতে বরযাত্রীদের গায়ে রং ছিটিয়ে দেওয়ার রেওয়াজ বহুদিনের, এই নিয়ে ঝামেলাও কম হয় না। বরপক্ষের আনা জিনিস পত্র নিয়ে ঘাটাঘাটি, সমালোচনা, রসাত্মক আলোচনা চলে কনে পক্ষের লোকজনের মধ্যে। খাওয়া-দাওয়া ও বিয়ে শেষে কনেকে বরের বাড়ীতে নিয়ে আসা হয়, সেখানে মহিলারা অপেক্ষা করেন ধান, দূর্বা, চিনি ইত্যাদি নিয়ে কনেকে সাদরে গ্রহণ করার জন্য। পরের দিন বৌভাত অনুষ্ঠিত হয়। সাধারণত দুই-তিন দিন পর বর ও কনে মেয়ের বাড়ীতে বেড়াতে যায়, যাকে ‘ফিরানী’ বলা হয়। কয়েক দিন সেখানে থেকে পুণরায় বর নিজের বাড়ীতে ফিরে আসেন।
প্রচলিত খেলাধুলা, খেলাধুলার বিবর্তন
পূর্বে এ অঞ্চলে প্রধান আমোদ প্রমোদ ছিল ঘুড়ি উড়ানো, নাচগান, লীলা ও তাস খেলা, নৌকাবিহার, পাশা খেলা, বানর লম্ফ, মোরগ লড়াই, দাড়িয়াবান্দা, কাবাডি, ক্যারম, গোল্লাছুট, দাবা, ব্যাডমিন্টন, ফুটবল, বৌচি ইত্যাদি। গোল্লাছুট, দাড়িয়াবান্দা, কাবাডি, মোরগ লড়াই ইত্যাদি খেলার স্থান ক্রমে দখল করে নিয়েছে ফুটবল, ক্রিকেট ইত্যাদি খেলা। প্রযুক্তির উন্নতির দরুন টেলিভিশনের মাধ্যমে অতি অল্প সময়ের মধ্যেই ফুটবল ক্রিকেট খেলা গ্রাম ও শহরে সমানভাবে জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। তাই আজ বেশিরভাগ মাঠই দাড়িয়াবান্দা, হা-ডু-ডু, বৌচি, গোল্লাছুট ইত্যাদির পরিবর্তে ক্রিকেট বা ফুটবল দখল করে নিয়েছে। তবে গ্রামে এখন ও বিশেষ করে মেয়েদের মধ্যে গোল্লাছুট, বৌচি ইত্যাদি প্রচলিত রয়েছে।
খাদ্যভ্যাস, মিষ্টি-মিঠাই-পিঠা, স্থানীয় বিশেষ খাবারজেলার গ্রামীণ উৎসব ও মেলায় নানা ধরনের ও বৈচিত্রে ভরপুর সৌখিন খাদ্যবস্তু পরিবেশন করতে দেখা যায়। এসবের মধ্যে রয়েছে মিষ্টি, নিমকি, খাস্তা, মুড়ির মোয়া, চিঁড়ার মোয়া, খৈ এর মোয়া, তিলের খাজা, কদমা, গজা, কটকটি, হাওয়াই মিঠাই ইত্যাদি। সকাল-এ ভাত/খিচুরী/রুটি, দুপুরে ও রাতে ভাত খাওয়ার প্রচলন দেখা যায়। তবে ‘জাউ’ এঅঞ্চলের একটি জনপ্রিয় খাবার বিশেষ করে অস্বচ্ছল বা গ্রামীণ পরিবারের মধ্যে। মিষ্টির মধ্যে রয়েছে, মুক্তাগাছায় মন্ডা, মালাইকারী, কালোজাম, রসমালাই, ছানার পোলাও এবং গুড়ের সন্দেশ ইত্যাদি।
জাতিগত/আঞ্চলিক/ভৌগোলিক বিশেষ অনুষ্ঠানমালাএ জেলায় বসবাসরত গারো, হাজং, কোচসহ অন্যান্য আদিবাসীরা তাদেরনিজস্ব সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানমালা পালন করে থাকে। এছাড়া বাংলাদেশের অন্যান্য অঞ্চলের মতন এ জেলার আদিবাসীরাও বৈশাখী মেলা, ঈদ উৎসব, দূর্গাপূজাসহ অন্যান্য উৎসব জাকজমকের সাথে উদযাপন করে থাকেন। এসব অনুষ্ঠানের মৌলিক বৈশিষ্ট্য হলো সাম্প্রদায়িকতা মুক্ত, নির্মল ভ্রাতৃত্ববোধ, জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে একে অন্যকে জানার স্পৃহা ও আগ্রহভরা অংশগ্রহণ।
সামাজিক রীতিনীতি/সংস্কার/কুসংস্কার/প্রচলিত ধ্যানধারণা
অতিথিপরায়ণতা এ অঞ্চলের একটি উল্লেখযোগ্য রীতি। ধনী গরীব নির্বিশেষে আপ্যায়ন বা মেহমানদারীর রীতিটি সত্যিই প্রশংসার দাবী রাখে। মুসলমানদের মধ্যে ধর্মীয় উৎসবসমূহে আত্মীয়দের বাড়ীতে বেড়াতে যাওয়া, নতুন কাপড় পরিধান করা, ভাল খাবার তৈরী করা ও অপরকে দাওয়াত করে খাওয়ানো, ঘনিষ্ঠদের নতুন কাপড় উপহার দেয়া ইত্যাদি রীতি অন্যান্য অঞ্চলের মতো এখানেও প্রচলিত। মুসলিম মহিলাদের মধ্যে পর্দা পালনের রেওয়াজ বিদ্যমান, অন্যান্য অঞ্চলের তুলনায় অধিকহারে। আদিবাসী ব্যতীত সব পরিবারই পুরুষ শাসিত। প্রায় সব ক্ষেত্রেই বিশেষ করে গ্রামে পুরুষেরা আয় রোজগার ব্যস্ত থাকেন আর মহিলারা ঘরের কাজকর্ম সামলান।
বাল্যবিবাহ, বহুবিবাহ, যৌতুক, নারী নির্যাতন সংক্রান্তশহরাঞ্চলে এবং শিক্ষিতদের মধ্যে বাল্যবিবাহের প্রচলন নেই বললেই চলে। তবে দরিদ্র এবং গ্রামীণ পরিবারে এখন ও বাল্য বিবাহ ঘটতে দেখা যায়। সামাজিক ভাবে বহুবিবাহ প্রশংসনীয় নয়। যৌতুক সম্পূর্ণ নির্মূল হয়নি- একথা বলা যায় তবে তার পরিমাণ হ্রাস পেয়েছে। কালের আবর্তে যৌতুকের পণ্যে পরিবর্তন এসেছে।সাইকেল, টিভি, রেডিও এর পরিবর্তে এখন জমি, চাকুরীর জন্য ঘুষের টাকা, বরের বিদেশ যেতে প্রয়োজনীয় টাকা দাবী করা হয় যা যৌতুকেরই বিবর্তন।